হয়তো শেষটাই এই গল্পের শুরু ~ আরিফ খন্দকার


তার আঙুল স্পর্শ করে আমি শিউরে উঠলাম। আমার হাত-পা কাঁপতে শুরু করলো। নতুন করে আমি আমাকে আবিষ্কার করতে শুরু করলাম। যে আমার কিনা এই মুহূর্তে তাকে আবিষ্কার করার কথা সে আমি তাকে আবিষ্কার না করে আমাকে আবিষ্কার করতে শুরু করলাম। কি অদ্ভুত! তার কথা আমি ভাবতে পারছি না। একদমই না। আমার সারাশরীর ঠান্ডা হয়ে এলো। একদম বরফের মতন। তার আঙুল স্পর্শ করে আমার মনে হলো লোমে ভর্তি কোনো জন্তুর হাত আমি স্পর্শ করলাম। কি ভয়ঙ্কর! অথচ আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমার চোখের সামনে সে ঘুমোচ্ছে।

তার চোখ-মুখ, তার সবকিছু কেমন যেন অন্যরকম সুন্দর মনে হচ্ছে আমার কাছে। আমি ভুল কিছু দেখছি না তো! ভুল কেনো হতে যাবে! আমি তাকে ডাকতে গিয়ে ডাকলাম না। ঘুমোচ্ছে, ঘুমুক। ঘুমের মানুষকে অযথা এই কিছুর জন্য ডাকতে হবে এটা আমি ভাবতে পারছি না। অথচ সে আমার স্ত্রী সুস্মিতা। বিয়ের পরপর সুস্মিতা একটা বদঅভ্যেস ছিলো মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়া, হঠাৎ হঠাৎ ভয় পেয়ে উল্টাপাল্টা কিছু বলা। 

আপাতত আর সে সমস্যাটা নেই। কিন্তু এমন কেনো মনে হচ্ছে এখন তাকে আমার! কেনো মনে হচ্ছে সে আমার অনেক অপরিচিত কেউ, কেনো মনে হচ্ছে আজ এই প্রথম বুঝি তাকে আমি স্পর্শ করলাম! আমি কিছুই ভাবতে পারছি না। কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছি! আমার সবকিছু উলটপালট লেগে যাচ্ছে! আমি আবারো সুস্মিতাকে স্পর্শ করলাম। কিন্তু এবার আমি স্পর্শ করে যা বুঝতে পারলাম তা বোঝার জন্য আমি একদমই প্রস্তুত ছিলাম না। 


হয়তো শেষটাই এই গল্পের শুরু ~ আরিফ খন্দকার, megh piyeoon

আমি বুঝতে পারলাম তার শরীর একদম আগুনের মতন হয়ে আছে। গরম তাওয়া অনেকক্ষণ চুলোর উপর রাখলে যেমন গরম ঠিক তেমনিই গরম। কি অদ্ভুত! এবার আর আমি তাকে না ডেকে পারলাম না। খুব কোমল গলায় ভয়ার্ত কন্ঠস্বরে তাকে ডাকতে লাগলাম, 'সুস্মি, সুস্মি, এ্যাই সুস্মি!' সুস্মিতাকে আমি সেই বিয়ের পর থেকেই আদর করে সুস্মি বলে ডাকি। এটা আমার ভালো লাগে। আমার এই আদরটা সুস্মিতাও খুব অনুভব করে। মুচকি মুচকি হাসেও। 

লজ্জাও পায় কখনো কখনো। ফর্সা সুস্মিতার পুরোটা চেহারা তখন টকটকে লাল হয়ে যায়। আহা, কি সুন্দরই না দেখায় তখন! অদ্ভুত রকমের লাগে দেখতে! আমার তখন কেবল তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করে সুস্থিতর দিকে। ইচ্ছে করে জনম জনম তাকিয়ে থাকি। এইযে জনম জনম তাকিয়ে থাকার যে আকাঙ্ক্ষাটা এই আকাঙ্ক্ষার জন্যই মূলত সুস্মিতার লাজুক চেহারাটাকে এতো সুন্দর মনে হয়। সুস্মিতাকে তিনটা ডাক দেওয়ার পরও তার ঘুম ভাঙেনি। সচরাচর সুস্মিতার ঘুম একটা ডাকেই ভেঙে যায়। আমার ভীষণ ভয় করতে লাগলো। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না এই মুহূর্তে আমার আসলে কি করা উচিত! আমি কি আনিস সাহেবকে ডেকে আনবো। 

আনিস সাহেব বাড়িওয়ালার একমাত্র ছেলে। এমবিবিএস ডাক্তার। তিনি উপরতলায় থাকেন। কিন্তু আনিস সাহেবকেও যে ডাকবো সে সাহসটুকুও আমার হচ্ছে না। কখনো তো এতো ভয় করেনি আমার! আমি কি তাহলে সত্যিই আমি আছি না আমার মধ্যে আমি অন্যকিছু আবিষ্কার করতে শুরু করছি! আনিস সাহেবকে ডেকে আনার সাহস হচ্ছে না বলে আমি হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা নিলাম। তাঁকে ফোন করতে লাগলাম। রিং হচ্ছে কিন্তু রিসিভ করছে না। হয়তো ঘুমোচ্ছে। রাতও তো কম হয়নি। আবার ফোন করতে লাগলাম। রিং হচ্ছে। 

এই রিং হওয়ার মধ্যে আমি স্পষ্ট শুনতে লাগলাম সুস্মিতা দাঁত দিয়ে শব্দ করছে। ভয়ঙ্কর শব্দ। ইঁদুর তার দাঁত দিয়ে কোনোকিছু কাটলে যেমন শব্দ হয় ঠিক এমন শব্দ। এমনও না অবশ্য তারচেয়েও ভয়ঙ্কর কোনো শব্দ। এরমাঝেই আনিস সাহেব ফোনের ওপাশ থেকে বলে উঠলেন, 'হ্যালো! এতো রাতে কে ফোন করেছেন, কেনো ফোন করেছেন বলুন!' আনিস সাহেবের এই একটা অভ্যেস তিনি ফোন রিসিভ করেই সব প্রশ্ন একসাথে করে ফেলেন যার কারণে তাঁকে খুব সহজেই সবকিছু বলে ফেলা যায়। আমিও অনায়াসেই বলতে শুরু করলাম সবকিছু।

তবে আমার বলার মধ্যে আনিস সাহেব একটা ভয় লক্ষ্য করলেন যার জন্য তিনি সহজেই কোনো উত্তর দিলেন না। সব ডাক্তারই বোধহয় এমন হয় নাকি তার ব্যতিক্রমও হয় কেউ কেউ! 'আনিস সাহেব আমি আপনাদের বাসার নিচতলা থেকে বলছি। জাফর চৌধুরী। আমার স্ত্রী সুস্মিতা ঘুমের মধ্যে কেমন যেন অদ্ভুত রকমের এক শব্দ করছে দাঁত দিয়ে। আর আমি হঠাৎ করে তার হাত স্পর্শ করে লোমে ভর্তি কিছু একটা টের পেলাম। আমার খুব ভয় হচ্ছে আনিস সাহেব! আপনি কি একটু দয়া করে আমার বাসায় আসতে পারবেন!' 'আপনার বাসায় আমার আসতে হবে না। 

শুনুন, আমি আপনাকে একটা কথা বলি, এটা তেমন কিছু নয়, এটা আপনার বিভ্রম মাত্র। মনের ভুল। আপনি আপনার স্ত্রীকে কোনো স্পর্শ না করে ঘুমিয়ে পড়ুক। যদি পারেন আপনি অন্যআরেকটা রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। আজ অন্তত আপনার স্ত্রীর কাছ থেকে আপনি একটু দূরে থাকুক। দেখবেন রাত কেটে গেলে আপনার মনের এই সমস্ত ভয়ও কেটে গেছে!' আনিস সাহেবের কথামতো আমি অন্যরুমেই ঘুমোতে চলে এলাম। কিন্তু রুমে আসামাত্রই আমি কিছু একটা টের পেলাম। আমার মনে হলো কেউ একজন আমাকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে। আমার সারা শরীর অবশ হয়ে যেতে লাগলো। অসাড় হয়ে যেতে লাগলো। 

স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি আমি কারোর চিৎকারের শব্দ। কোনো বাচ্চার। কিন্তু আমার বাসায় কোনো বাচ্চা নেই। বাচ্চার চিৎকারের শব্দ তাহলে ভেসে আসছে কোথা থেকে! আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার অবুঝ মন আরো অবুঝ হয়ে গেলো। আমার চারপাশটা ভয়ে ডুবে যেতে লাগলো। আমি বোকা নির্বোধ হয়ে কেবল তা সহ্য করে যেতে লাগলাম। কি নির্মম! সুস্মিতার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে মাত্র দু'বছর। আমাদের এখনো কোনো সন্তান-সন্ততি হয়নি। হয়তো বা হবে। সন্তানের কথা এই মুহূর্তে আমি তেমন ভাবছিও না কারণ সুস্মিতার মধ্যে আমি যে পরিবর্তন টের পাচ্ছি তা আমাকে খুব ভাবিয়ে তুলছে। কোনোমতে আমি বিছানায় এসে শুলাম। টের পেলাম আমার বুকের উপর কেউ বসে আছে। নড়ছে না, একদম স্থির। মানুষ কখনো এতোটা স্থির থাকে না। এটা মানুষ না, অন্যকিছু। 

আমি চোখ বন্ধ করলাম। আমার সারাশরীর ঝিমঝিম করছে। অদ্ভুত রকমের এক শিহরনে অস্থির করে তুলছে। আমি প্রবল স্বরে শব্দ করে একটা ডাক দিলাম, 'সুস্মি' বলে। সুস্মিতা আমার ডাক শুনেই বললো, 'আমিতো এখানেই আছি! কষ্ট করে এতো জোরে আর ডাকছো কেনো?' আমি আরো ভয় পেয়ে গেলাম। অবাক হয়ে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, 'তুমি, তুমি এখানে কখন এলে? তুমি না ঐ রুমে ঘুমোচ্ছিলে?' 'আমি ঘুমুচ্ছিলাম না। আমি জেগেই ছিলাম। তুমিই আমাকে ভুল দেখেছো। ভুল দেখতে দেখতে আমাকে তুমি তোমার দেখার, ভাবার বিভ্রম করে তুলেছো। 

তুমি যেখানেই থাকো আমি জানি তুমি আমাকে নিয়ে যে কত রকমের হাজারটা ভুল ভাবনা আবিষ্কার করো!' সুস্মিতার কথা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। আশ্চর্য! সে এতোকিছু জানে কি করে! অবশ্য মেয়েটা একটাও মিথ্যা কথা বলছে না। তার সব কথাই সত্যি। কিন্তু এই সত্যি কথাগুলো তাকে এসে কে বলে? কেই বা বলবে, আমি তো আর এগুলো কারোর সাথে বলি না, আমি কেবল মনে মনে ভাবি! তাহলে? সুস্মিতার কথা শুনে আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না। আমি ভাবতে না পেরে তাকে বললাম, 'আমার জন্য এককাপ চা বানিয়ে আনবে সুস্মি? আমার খুব চা খেতে ইচ্ছে করছে! খুব!' আমার কথা শুনে কিছু না বলেই সুস্মিতা চা বানাতে চলে গেলো। আমি বারান্দায় এসে একটা সিগারেট ধরালাম। 

এই মুহূর্তে আমি সিগারেট ফুঁকা ছাড়া আর কিছুই ভাবছি না। অবশ্য সবসময় ভাবতে নেই। কখনো কখনো ভাবনাচিন্তা ছাড়া কেবল নিজেকে নিয়ে থাকতে হয় যে সময়টা কেবলই নিজের। সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে দেখতে পেলাম বাদুড় লাফালাফি করছে। সাথে পেঁচার ডাক। এই বাড়িটা অবশ্য অনেকটা জঙ্গলের মতন। 

এমন কোনো গাছ নেই যে এই বাড়তে নেই। আম, কাঁঠাল থেকে শুরু করে মেহগনি, সেগুন, তেঁতুল প্রায় সবধরনের গাছই এই বাড়িতে আছে। এই বাড়িটাকে অবশ্য মিনিফরেস্ট বলা যেতে পারে। সুস্মিতা চা বানিয়ে নিয়ে এলো। এসে কিছুই বললো না কেবল বড়ো বড়ো চোখ করে তাকালো। তার চোখ দেখে অনেকটা পেঁচার চোখের মতো মনে হলো। মনে হলো তার চোখের ভেতর থেকে আবছা কোনো আলো ভেসে আসছে। যে আলো স্বাভাবিক কোনো আলো নয়। 

অস্বাভাবিক। আমি তার হাত থেকে চায়ের কাপটা বাড়িয়ে নিলাম। আমার হাত কাঁপছে। চায়ে চুমুক দিয়ে আমার মনে হলো সে মাত্রই বুঝি চাটা ফ্রিজ থেকে নামিয়ে এনেছে এতো ঠান্ডা চা বরফের মতন। তাকে কিছু বলার সাহস আমার হলো না। না বলে আমি এই ঠান্ডা চাটাই গরম চায়ের মতো করে ফুঁ দিয়ে দিয়ে খেতে শুরু করলাম।

~ হয়তো শেষটাই এই গল্পের শুরু ~ আরিফ খন্দকার


পড়ুন আয়াতুল কুরসি ↓

The Throne of Allah

1 Comments

Post a Comment

Previous Post Next Post