অপেক্ষাময় ভালোবাসা ~ হৃদয় খান


- তোমার হাতটা একটু ধরি? 

- এত মানুষের ভিড়ে? 

- তাতে কী? 

- কতটা ভালেবাসি তার প্রমাণ দিতে চাচ্ছ? 

- এটা কী ধরণের কথা অয়ন? 

অয়ন উত্তর দিলো না। সে তাকিয়ে রইল ডান পাশের বিস্তৃত জলরাশির ছোট্ট ছোট্ট তরঙ্গের দিকে। সন্ধ্যার বুকে একরাশ বিষাদ নেমে আসার মতো প্রবল বিষাদে ডুবে গেল অনুর প্রফুল্ল মন। অনুর কি কান্না পাচ্ছে? কি জানি, হয়তো! নারীর মন হয় কবুতরের পালকের মতো কোমল। তার থেকেও কোমল হয় বুকের ভেতর অদৃশ্যে লুকিয়ে থাকা ‘মন’। বড্ড অভিমানীও বটে। হঠাৎ অনুর চোখটা ঝাপসা হয়ে আসলো। বুকের ভেতরটা বোবাকান্নায় ডুবে গেল। আচ্ছা অয়ন কি তা জানে, অনুর কি ভিষণ কান্না পাচ্ছে তার অতটুকুন কথা জন্য? হয়তো জানে না। জানবে কী করে! 

 মনতো খোলা চিঠি নয় যে কেউ পড়তে পারবে। কিন্তু অয়নের কাছে যেন অনুর মনটা খোলাচিঠির মতো কি সহজ, সুস্পষ্ট, পরিষ্কার ভাবে পড়তে পারে। কেননা মনের সকল কথা জমে থাকে চেহারা জুড়ে, চোখ জুড়ে, তিরতির কাঁপতে থাকা ঠোঁটের মাঝে। নিরবতা ভেঙে অনু বলল,‘ কী হয়েছে তোমার অয়ন? আজ তোমাকে অন্যরকম লাগছে। এই দিনে বিষণ্ণ মনে আমাদের দেখা হবে আমার কল্পনাতীতও ছিল না।’ অয়নের পরিবর্তন নেই। 

ছেলেটার আজ কী হলো? ভাবনার জগতে জমে গেল অনু একটা ছোট্ট অনুর মতো। হঠাৎ অনু দাঁড়িয়ে গেল। অয়ন হাটছে উদভ্রান্তের মতো। দুজন হাঁটতে হাঁটতে অনু যে দাঁড়িয়ে গেছে তা বেখেয়ালি ছিল। হঠাৎ অয়ন অনুভব করল কিছুটা নেই নেই। দ্বিধান্বিত চোখে পাশে তাকাতেই আঁতকে উঠে। অনু তাকিয়ে আছে নিরব, স্থির, অসহায়ের মতো। অয়নের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল কেন জানি। অয়ন আবার ফিরে গেল অনুর কাছে। ‘কী ব্যাপার দুম দাঁড়িয়ে গেলে কেন? ’ ঝাপসা চোখ অশ্রুতে পরিপূর্ণ হয়ে টুপ করে ঝরে পড়ল দুফোঁটা অশ্রু। অয়ন বিষ্ময়ের চোখে তাকিয়ে রইল। 

 অনু ভেজা গলায় বলল, ‘ তুমি কি জানো অয়ন, তোমায় কি ভিষণ ভালোবাসি? তোমার জন্য প্রতিটা মুহুর্ত বুকের ভেতর কতখানি কান্না জমে ? কি প্রবল তেষ্টায় খাখা করে এই দু'নয়ন? কি ভিষণ প্রশান্তির জন্য উদ্বিগ্ন এই হাত দু'টি একটু ছু্য়ে দেওয়ার জন্য? তুমি কি জানো অয়ন? জানো কি বলো?’ আজ বাংলা সনের প্রথম দিন। পহেলা বৈশাখ। তাই রাজ্যের সকল মানুষ যেন নেমে এসেছে ঘর ছেড়ে। যে দিকে তাকায় সে দিকে আপত্তিকর ঘটনা চোখে পড়ছে অয়নের। অয়ন জানে এগুলো দেখা ছাড়া তার কিছুই করার নেই! অয়নের মন খারাপ অন্য বিষয় নিয়ে। আজকালকার প্রেমিক প্রেমিকারা ভালোবাসা খোঁজে শারীরিক গোপন অঙ্গে স্পর্শের মাঝে। একে অপরকে শরীরের গভীরে ছুঁয়ে দেখার মাঝে। 

আসল কথা এগুলো ভালোবাসা নয়, ভালোবাসার ভান ধরে কামনার সুখ খোঁজা! অনু যখন অয়নের হাতটা ধরতে চেয়েছিল তখন অয়নের মনে হচ্ছিল সেও তাদেরই মতো কেউ। ছিঃ ছিঃ! কী ভাবছে এসব! অয়ন জানে, জগতে শুদ্ধতম ভালোবাসার মধ্যে তার ভালোবাসা একটা। অয়নও যে কি ভিষণ পাগলের মতো অনুকে ভালোবাসে তা কি অনু জানে? অনুর মতো তারও হাত ধরে চলতে চায় উদভ্রান্তের মতো। অনুর চোখের জল মুঁছে দিলো। আশেপাশের কিছু মানুষ আড় চোখে দেখছে তাদের। অয়ন নরম গলায় বলল, ‘ তুমি কি জানো অনু, স্পর্শ না করেও কতটা ভালোবাসায় স্পর্শ করা সম্ভব? ছুঁয়ে দেওয়ার মাঝেই কেন কতটা ভালোবাসি প্রমাণ করতে হবে, সুখ খুঁজতে হবে সকলের মাঝে? ছুঁয়ে না দিলে কি ভালোবাসা যায় না? তুমি কি জানো, তোমার জন্য বুকের ভেতরে আমারও কি ভিষণ কান্না জমে? 

 কি ভিষণ উৎসুক হয় তোমার দুহাত জড়িয়ে বিষাদি সন্ধ্যা পার করে দেব কি পরম সুখে? তুমি কি জানো অনু?’ অনুর চোখ ভরে এলো আবারও এক সাগর অশ্রুতে। অনু নির্বাক দাঁড়িয়ে। অয়ন বলল, ‘ হাতে হাত চলার মধ্যেই কিন্তু শান্তি থাকে না। হাত হাত না রেখেই রবং কী প্রবল ভালোবাসা, ভালোলাগা, আকাঙ্ক্ষা জমে যায় দুটি মানুষের মনের ভেতর। এই যে একে অপরকে একটু ছুঁয়ে দেওয়ার জন্য, একটু স্পর্শের জন্য ব্যাকুল হয় বুকের ভেতর। 


অপেক্ষাময় ভালোবাসা ~ হৃদয় খান, Megh Piyeoon


এই ব্যাকুলতা জুড়ে থাকে অপেক্ষা, আর সেই প্রবল অপেক্ষা জুড়ে থাকে বিশুদ্ধতম দুজন মানুষের গভীরতম ভালোবাসা। আমি সেই অপেক্ষার ভালোবাসা পেতে চাই, দিতে চাই তোমাকে। তুমি কি নেবে সেই অপেক্ষারত ভালোবাসা? ’ অনু কী বলবে? কিছুটা বলতে চাইছিল কিন্তু কেন জানি পারল না। কিছু কিছু সময় চুপ থাকতে হয়! সে অশ্রু চোখে তাকিয়ে রইল অয়নে মুখের পানে। কী মায়া জমে আছে! অনু সেই মায়াতে নিঃস্ব হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। গো

ধূলি বিকেলটা কেমন মায়াময় হয়ে উঠল আজ। কী প্রবল মায়া, গভীর ভালোবাসা বুকে পুষে রাখে ছেলেটা! এতটা ভালোবাসা কেউ পুষে রাখতে পারে? এত এত মানুষকে সাক্ষী রেখে অনুর খুব চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছিল, “ অয়ন, অপেক্ষার নামই তো মানবজনম! সেই মানবজনম থাকে কী প্রবল ভালোবাসার অপেক্ষায়। আমি তোমার সেই প্রবল ভালোবাসার জন্য অপেক্ষা করব। সেই অপেক্ষায়ই শেষ হবে আমার জনম! ” 


অপেক্ষাময় ভালোবাসা ~ হৃদয় খান

1 Comments

Post a Comment

Previous Post Next Post