অনুতপ্ত ~ হৃদয় খান



আমি কখনো মা হতে পারব না!’ ‘ হুম। ’ ‘ মন খারাপ হয় না? ’ ‘ উহু, কষ্ট হয় । ’ ‘ খুব বেশি? ’ ‘ তোমার মন খারাপ থাকলে আমার কষ্ট হয়। বাবা ডাক শোনার জন্যে কষ্ট না হলেও অন্ধকারে পাশ ফিরে লুকিয়ে লুকিয়ে চোখের জলে তোমার বালিস ভেজানোতে আমার তার চেয়ে অধিক বেশি কষ্ট হয়। ফুটফুটে নিষ্পাপ শিশুর কিন্নরের কণ্ঠের ন্যায় কান্না-হাসির শব্দ কিংবা মুখাবয়ব দেখার কষ্টের থেকেও তোমার মলিন, ধূসর, বিষণ্নভরা চেহারা দেখলে আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। অসহায় লাগে খুব। ’ নীরা কথা বলতে চেয়েও অবশেষে একটা কথাও আর বলতে পারল না। চোখের জলে বুক ভেসে যাচ্ছে মেয়েটার । একটা মানুষ এতটা ভালোবাসতে কী করে পারে? নীরা কোনো কথা ছাড়ায় অনিকের বুকের ভেতর ঢুকে গেল। নীরা এই একটা প্রশ্ন পূর্বেও অসংখ্যবার করেছে কিন্তু অনিক অবিশ্বাস্য ধৈর্যের সহিত কঠিন প্রশ্নের জবাবগুলো নীরাকে এলোমেলো করে দিয়েছে । অনিক বোঝে, নীরা কেন বার বার ঘুরেফিরে আপত্তিকর প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করে! অনিক সব জেনে বুঝেও চুপচাপ না বুঝার মতো ঘাপটি মেরে নির্বিকার চোখ মেলে মুচকি হাসে। নীরা সেই হাসিতে নতুন করে প্রেমে । আচমকা তার কেমন তেষ্টা পায়। গলায় নাকি বুকে সে জানে না! অনিক ও তার ভেতরকার দূরত্ব সবটুকু ঘুচিয়ে পাগলের মতো চুমো খায় নীরা। তার তেষ্টা কমে না৷ অস্বাভাবিক বরং বেড়ে যায়। এই তেষ্টা কিসের, মাতৃত্বের নাকি ভালোবাসার? পূর্ণতার নাকি অপূর্ণতার? অনিক নীরাকে হাত বাড়িয়ে কাছে টানে। গভীর রাত। বাইরে তারস্বরে ঝিঁঝিপোকার ডাক ভেসে আসছে একজোড়া দুখি, বঞ্চিত, অসহায় দম্পতির কর্ণে। আজ বুঝি জোছনা নামেনি! অনিক কিংবা নীরা জানে না বাইরে জোছনা আছে কি না! থাকলেও বা কী? নীরা এখন অনিকের বুকের ভেতর ছোট্ট পাখির মতন মিশে থাকবে। অনিকের বুকের লোমে নাক ডুবিয়ে অনিকের শরীরের ঘ্রাণ নিতে চায়। সে এখন বাইরে বের হবে না। অনিক তাকে জোর করবে, তবুও না ৷ কিন্তু আজ অনিক তাকে জোর করল না। নীরা নিশ্চুপ, শান্ত তুলতুলে পাখির মতো মিশে রইল অনিকের বুকের ভেতর। অনিক কপট বিরক্ত মাখা গলায় নীরাকে বলল ‚‘ তুমি বার বার একই প্রশ্ন কেন করো তা আমি জানি, আমি বুঝি তুমি কী বলতে চাও। ’ নীরা কোনো কথা বলল না। সে যেমন ছিল তেমনই রইল চোখ বন্ধ করে অনিকের বুকের লোমে নাক ডুবিয়ে । অনিক নীরার সিঁথি বরাবর ললাটের এক ইঞ্চি ওপরে চুমো খেল ৷ তারপর বলল ‚‘ তুমি নিজেকে নিজের কাছে চরম অপরাধী মনে করো, কিন্তু কেন? এখানে তো তোমার দোষ নেই। সৃষ্টিকর্তা আমাদের ভাগ্যে সন্তান লেখেননি বলেই তো আজ আমরা বঞ্চিত তাই না? তাহলে নিজেকে অপরাধী ভেবে কেন নিজেকে কষ্ট দেও ? দোষারোপ করে দুখি হও? ’ নীরা অবাধ গলায় স্পষ্ট বলল ‚‘ আমাদের না অনিক, বলো আমার ভাগ্যে লেখেননি। আমার জায়গায় আজ নতুন কেউ আসলে কিন্তু এই শূন্যতা আর থাকত না। এই ভাবনাটা পাল্টে যেত। বাবা শোনার জন্য বুকভার হাহাকার থাকত না অনিক। ’ অনিক কিছু বলল না। সময় নিয়ে তারপর বলল‚‘ তুমি চাও আমি আরেকটা বিয়ে করি, নতুন সংসারে নতুন কারও মাধ্যমে আমার ঘরে সন্তান আসুক ? তোমার এই ভাবনা কোনোদিন সফল হবে না । যাকে ভালোবেসেছি তাকেই বিয়ে করে জীবনের শেষ দিন অবধি সঙ্গী করার শপথ করেছি । তাকে কোনোদিন আমি কষ্ট দিতে পারব না। আমি তো কোনোদিন বলিনি, আমার সন্তান লাগবে, আমার বাবা ডাক শুনতে ইচ্ছে করছে। তোমাকে মানসিকভাবে আঘাত করিনি। আমার নিয়তিকে আমি সাদরে গ্রহণ করেছি। কোনোদিন তো কিছুই বলিনি, তাহলে তুমি এত দূর পর্যন্ত কেন ভাবছো? ’ নীরা ইতস্তত করে বলল ‚‘ জীবনে সন্তানের কি প্রয়োজন হয় না? বাবার হওয়ার স্বপ্ন প্রতিটা পুরুষই পুষে রাখে, অনুভূতিটুকু যত্নে আগলে রাখে ওই দিন অবধি, যেদিন প্রথম জানতে পারে সে বাবা হতে চলেছে সেই উচ্ছ্বাসিত চেহারা, অবর্ণনীয় অনুভূতি, উত্তেজনা জমে থাকা সুপ্ত হাহাকার বুকের ভেতরটা গলতে থাকে একটু একটু করে একটা মাত্র ধ্বনি শোনার জন্য ‘বাবা ’। অনিক দীর্ঘশ্বাস অন্ধকারে মিশিয়ে বলল ‚‘ জীবনের সব চাওয়া পাওয়া পূর্ণতা পায় না। জীবন মানে আক্ষেপের আরেক নাম। জীবনজুড়ে আক্ষেপ থাকবেই, শূন্যতা থাকবেই, অপূর্ণতা রয়ে যাবে এটা ঐশ্বরিক পরিকল্পিত সীমাবদ্ধ করা এক অখণ্ডিত নিয়ম। তাই এসব ভাবনা মস্তিষ্কের কোণা কোণা থেকে ঝাঁট দিয়ে ঝেড়ে ফেলো৷ সকালে না তোমার স্কুলে যেতে হবে? ’ নীরা আর কথা বাড়াল না। অনিক টপিকটা এড়িয়ে যেতে চাচ্ছে। নীরা কিছু বলল না। তবে বুকভার অভিমান জীবনের উপর অনড় করে এক চূড়ান্ত বঞ্চিত নারীর তীব্র যন্ত্রণা আড়াল রেখে লক্ষ্মী মেয়ের মতো ঘুমিয়ে গেল। অনিক নীরার দিঘল ঘন চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। তার এক মাত্র ভয় তার মা খাইরোন বানুকে নিয়ে। তারপর পাড়াপ্রতিবেশি, ঝিঁ-চাচিদের মুখে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যভরা নানা কুসংস্কার মূলক আদিম মানসিকতার ভাবনার প্রকাশ তো আছেই । নীরাকে এই নিয়ে নানাভাবে কথা শুনিয়ে আসছে। সরাসরি ছেলের বউকে কিছু বলতে না পারলেও বিষয়টা কেন্দ্র করে পড়শিদের সঙ্গে পান বাটি সঙ্গে নিয়ে দুনিয়ার তাবৎ কষ্ট, হাহাকার ঢেলে গল্পের পরশা সাজিয়ে কাটিয়ে দেয় একটা বেলা। নীরা গ্রামের উচ্চমাধ্যমিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বাংলা পড়ায়। শিক্ষিকা হিসেবে অল্প সময়ের সুনাম কুড়িয়েছে মেয়েটা। আপন করে নেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছে। নীরা ও অনিকের বিয়েতে অনিকের মা তুষ্ট হননি বরং অতিষ্ঠ হয়েছেন। তুষ্ট না হওয়ার কারণ মেয়ের বাবার টানাপোড়ের সংসার টানতে টানতে জীবনের বেলা ফুরিয়ে ফেলে ক্ষীণ আধো আলো আধো আঁধারে যাপন করছে। খায়রোন বানু বড় স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। তাই বড় ছেলেকে নিয়ে মহা আনন্দে সাজিয়েছিলেন বেশ বড়সড় স্বপ্ন । মনে মনে ছেলের জন্য পাত্রী দেখে আধেক বিবাহ প্রায় ঠিকঠাক করেছিলেন। মেয়ের গায়ের রঙ সামান্য ময়লা ময়লা হলেও সে ময়লা ঢেকে দেওয়ার চমকপ্রদ গ্রামীণ চিরাচরিত নিয়মের ধারায় ব্যবস্থাও করেছিল। কন্যার পরিবার উচ্চশিক্ষিত পাত্রে সঙ্গে পাত্রস্থ করতে চান তাদের একমাত্র কন্যাকে। আবার দূরপাল্লায়ও কন্যাকে বিবাহ দিতে চান না ৷ একটা মাত্র কন্যা। বড্ড আদরে আদরে বড় হয়েছে । চোখের সামনেই রাখবে। তার জন্য পাত্রপক্ষের মুখবলি শর্তে রাজি। মেয়ের বাবা সে অঞ্চলের ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের একজন ধান-পাট-সার-ডিজেলের রমরমা ব্যবসা । খায়রোন বানু মহা খুশিতে আত্মহারা৷ কিন্তু সেই খুশিতে যত্ন করে ছাই ঢেলে দিল সুপুত্র অনিক। ছাই এর আড়ালে ঢেকে যাওয়া খুশি আর কখনও ফিরে আসেনি সেদিনের পর থেকে। কিন্তু ইদানীং আবার মানুষটার খুশিতে চোখ মুখ চকচক করে নদীর পাড়ের চকচকে বালুর মতো। অনিকের এতে ভয় হয়। , একদিন অফিস ফেরত অনিক সদ্য উঠনে কদম ফেলতেই ঘরের দাওয়া থেকে খায়রোন বানু মুখে দুটো যৌথ পান গুঁজে দিতে দিতে ডাকল ‚‘ খোকা আইসিস? ’ অনিকের ক্লান্ত শরীর। তার এখন স্নান করে একটু বিশ্রামের প্রয়োজন। তবুও অনিক তার মাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ভক্তি করে। জীবনে একটা মাত্র আদেশ অমান্য করে ভালোবাসার মানুষটাকে জীবন সঙ্গিনী করেছে। অনিক জানে না এই অবাধ্যগত হওয়ার অপরাধ কবে ঘুচবে। অনিক অপেক্ষায় আছে। অনিক মায়ের পাশে সুবোধ বালকের মতো দাঁড়িয়ে বলল ‚‘ তোমার শরীর কেমন এখন মা? বাতের ব্যথা বেড়েছে না আগের মতোই? ’ খায়রোন বানু দুঃখিত গলায় বললেন ‚‘ আমার আর শইল! শইল ভালা হইয়া কি হইব? যাগো লাইগা শইল ভালা রাখব তাগো তো আর দেহা হইব না জেবনে। আল্লাই আমায় কপালডারে ভাঙ্গা দিছে। ' অনিক বোঝে তার মায়ের কথা। এমন সুর কেটে কত কত কথা বলে। অনিক সেগুলো আগ্রহী শ্রোতার মতো শুনলেও গুরুত্ব দেয় না। অনিক বিনীত ভঙ্গিতে বলল ‚‘ থাক না মা এসব কথা এখন। ’ খায়রোন বানু হঠাৎ কান্নার গলায় বললেন ‚‘ হ থাকবই তো থাকব না। আমার কথা আর ভালো লাগবে ক্যান, আইজ আমার কথা শুনলে এই কুক্ষণে দিন দ্যাখতে হইত না। এত্তদিন বাড়ির উঠার জুইড়া গুর গুর কইরা নাতি-পুতিরা ঘুরঘুর করত। ’ অনিক বড্ড অসহায়বোধ করে। সে কথা বলে না। কিছু বললেও তা অগ্রহণযোগ্যতা পাবে। খায়রোন বানু বললেন ‚‘ আমি প্রত্তমেই বুঝেছিলাম এই মাইয়ার দোষ আছে। আমার মনে কুঁ ডাকে। অনিক খোকা একটা বার মায়ের কথা শুননা বাবা। তুই আরেকটা বিয়ে কর বাবা। এমনে কইরা কি আর জেবন চলব? ’ অনিক একটু শক্ত হয়ে বলল ‚‘ মা আস্তে বলো। তোমার বউমা শুনলে কী ভাববে বলোতো? মেয়েটা এমনই কষ্টে কষ্টে জীবন পার করছে, পাড়াপ্রতিবেশির কথাবার্তায় জীবনের উপর অধৈর্য্যে হয়ে পড়ছে। অন্তত তুমি এমন করো না মা। আমি ভালো আছি তোমার বউমাকে নিয়ে। আমরা ভালো থাকব মা। আমি যাই মা। তুমি নিয়মিত ঔষুধ খেয়ো কিন্তু। ’ অনিক জানে নীরা সব শুনেছে তবুও টুঁ শব্দ করবে না মেয়েটা। কিছু কিছু মেয়ে এতটা সহনশীল হয়, ধৈর্যশীল হয়,জীবনের উপর দিয়ে মহা প্রলয় বয়ে গেলেও মেয়েটা অমনই থাকবে বিধ্বস্ত মনে। , নীরার সন্তান হবে না এই খবরটা কেমন করে কেমন করে গ্রামের প্রতিটি ঘরের দ্বারে দ্বারে ডাক চিঠির মতো পৌঁছে গেছে । পান খেতে খেতে আয়েশ করে গল্প জুড়ে এই মানুষগুলো। গ্রামের রাস্তায় বের হলেই নীরার ডাক পড়ে, ‘ ও বৌমা এদিকে আহো! ’ নীরা বোঝে কেন ডাকছে। তবুও হাসিমুখে যায় ‚‘ জ্বি চাচি বলুন। আপনার শরীর কেমন?’ জীবনের উপর বিতৃষ্ণা প্রকাশ করে নাক-মুখ বাঁকিয়ে সুর করে বলে‚ ‘ শইলের আর অবস্থা কি গো মা। এহন আল্লাই যেমন রাখব তেমন থাকতে হইব। তয় রাইত হইলেই বাতের ব্যাদনাটা চিরচির কইরা বাইড়া যায়। কাপড়ের পুঁটলি বাঁইধ্যা হারিকেনের আগুনের ছ্যাক দিলে আরাম ঠ্যাহে । ’ নীরা দুঃখপ্রকাশ ভঙ্গিতে বলল ‚‘ বয়স হলে শরীরে রোগব্যাধি বেড়ে যায়। শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে আসে এজন্য। ’ চাচি এবার হিসহিসিয়ে আসল কথা বলল‚‘ তা বউমা হুনলাম, তোমার নাকি বাচ্চা হইব না। কথাডা কি সত্য? আহারে চান্দের লাহান ফকফক্যা চেহারা মাইয়াডা। হইলেও কি হইব। পোড়া কপালী হুনতে হুনতে জেবন কাটাইতে হইব। আহারে! 

অনুতপ্ত ~ হৃদয় খান, Megh Piyeoon, মেঘপিওন

হুনো মা, মোল্লাগঞ্জে যাইয়া পীর বাবার দরবারে মানত করোগা দেইখো বাবার দোয়াই সব দোষ কাইটা যাইব। ’ নীরা পূর্বের জানত এমনই কিছু শুনতে হবে বলে প্রস্তুতি নিয়েই রেখেছিল। তারপরও সকল প্রস্তুতি যেন এক মুহুর্তে সুতীব্র আঘাতে ভেঙে ফেলার প্রাণপণ চেষ্টা করছে এই কথাগুলো। নীরা কথা এড়িয়ে গেল ‚‘ চাচি আমার স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে, আজ তাহলে আসি। সময় করে কথা বলব। ভালো থাকবেন, আর শরীরে যত্ন নিয়েন। ’ কথা শেষ হতেই ঘুরে পা বাড়াল তার গন্তব্যে। কিন্তু মনে হচ্ছে নীরার পা চলছে না। স্থির, গতিহীন দাঁড়িয়ে আছে একই স্থানে। এই পৃথিবীর থমকে গেছে। যেন আচমকাই এক মহাপ্রলয় বইতে আরম্ভ করেছে তার বুকের ভেতর। নীরা মাঝ পথে দাঁড়িয়ে গেল। মাথার দুপাশ থেকে কেমন চিনচিন সুক্ষ্ম ব্যথা অনুভব করছে। স্কুলে যাওয়ার মানসিকতা হারিয়ে ফেলেছে নীরা। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস হাওয়ায় ভাসিয়ে নীরা বাসায় ফিরে এলো। খায়রোর বানু পাশের বাড়ির সেলিমের মা ও হাসনার মাকে নিয়ে গল্পে আসর বসিয়েছেন। এসময় নীরার বাড়িতে ফিরে আসায় যারপরনাই অবাক হলেন খায়রোন বানু । নীরার মুখাবয়বে একজন বিধ্বস্ত, ক্লান্ত, অবসাদের ছাপ স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। খায়রোন বানু টুঁ শব্দও করলেন না। নীরাও কোনো কথা না বলে ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে বিছানায় বসে পড়ল। চিনচিনে ব্যথাটা ক্রমশই তীব্রতর বৃদ্ধি পাচ্ছে। একটা প্যারাসিটামল খেলে নিল। তারপর বিছানায় শুয়ে পড়ল। শরীরটা ভালো লাগছে না মোটেই। ইদানীং বড্ড ঘুমের সমস্যা হচ্ছে। রাতভর ঘুমাতে পারে না। তবু অনিকের জন্য নীরা ঘুমের অভিনয় করে চোখের পাতা বন্ধ করে দূর্বিষহ গোটা রাত্রিটা পার করে দেয়। একটা যন্ত্রণা রাতভর তাকে কুটকুট করে কাঠ পোকার মতো কুরেকুরে খায়। বালিশ ভিজে যায় নীরব কান্নার চোখের অশ্রুতে। জীবনটা তার অভিশপ্ত মনে হয়, না হলে এমন কেন হলো তার সঙ্গে? নীরা যথেষ্ট বুদ্ধিমতী, সংবেদনশীল, ধৈর্যশীল নারী। সবকিছু যুক্তিতর্কের মাধ্যমে পরামর্শে সিদ্ধান্ত নিতে ও দিতে বেশ পারদর্শী। প্রখর আত্মশক্তি মানুষ হয়েও একটা মাত্র ব্যাপারে সে নিজেকে কোনো ভাবে সান্ত্বনার মাধ্যমে মেনে নিতে পারছে না। দীর্ঘ নির্ঘুম রাত জাগা ক্লান্ত চোখে কেমন আদুরে ঘুম নেমে এসেছিল। নীরা কখন ঘুমিয়ে পড়ে খেয়াল ছিল না। কাঠের দরজায় ঠক ঠক শব্দে নীরার ঘুমের পতন ঘটল। সদ্য ঘুমভাঙা চোখের পাতা না খুলেই শব্দটা শুনতে মন্দ লাগছে না। দরজার ওপাশ থেকে খায়রোন বানুর ঝাঁঝালো আওয়াজ ভেসে আসছে। নীরা চট করে উঠে বসল। মুহুর্তক্ষণে বুঝল এভাবে উঠে বসা উচিত হয়নি। মাথার ভেতর চক্কর দিয়ে উঠল। দুহাতে মাথার পাশের শিরা চেপে ধরল। নিজেকে ধাতস্থ করে বন্ধ দরজা খুলে দেয়। বাইরে চৈত্র মাসের সূর্যের তীব্র আলোক ছটা চোখে লাগছে। খায়রোন বানু ভ্যাবাচাকা খাওয়ার মতো দাঁড়িয়ে আছেন। দেখতে অসহায় অসহায় লাগছে। যেন তিনদিন আগে তার স্বামী মারা গেছে। নীরা কিছু বলার আগেই খায়রোন বানু বললেন ‚‘ কি হইছে বউ মা, আইজ আচানক বাড়িত আইলা? ইসকুল গেলা না, বাড়িত আইয়া ঘাপটি মাইরা দরজা দিয়া অবেলায় কাইত হইয়া শুইয়া রইলা। শইল খারাপ করছে নাহি? ’ কথা শেষ করতেই খায়রোন বানুর খসখসে হাতখান কপাল ছুঁয়ে দিল। নীরার বিরক্ত হওয়ার কথা ছিল হয়ত কিন্তু তার বিরক্তের বদলে যা হলো অন্য কিছু। এই ছোঁয়াটুকুন তার এত ভীষণ ভালো লাগল যে শরীর জুড়ে এক মুহুর্তে প্রশান্তির জোয়ার বয়ে গেল। নীরার চোখ ছলছল করে উঠল। ছলছল চোখে নীরা তাকিয়ে আছে তার শ্বাশুড়ির বিভ্রান্ত চেহারার দিকে। নীরা অবচেতনে ডাকল ‚‘ মা, আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেবে? ’ নীরার গলায় কিছু কী ছিল? হয়ত! খায়রোন বানুর কী হলো কে জানে, তিনি আর কথা বললেন না। নীরা শুয়ে আছে খায়রোন বানুর কোলে মাথা রেখে। খায়রোন বানু হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মাথায়। মেয়েটা এমন করে আগে কখনও মুখ ফুটে কিছুই বলেনি। আকস্মিক আজ বলাতে খায়রোন বানুর ভেতরে বয়ে গেল একটা মাতৃত্বের অনুভূতি। সেও তো মা! সন্তানের অমন ডাক অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা কোনো মায়ের আছে কী? মা তো মা-ই! নীরা কথা বলল, ‘ মা একটা কথা বলি? ’ খায়রোন বানু বললেন ‚‘ কও। ’ নীরা ইতস্তত করে বলল ‚‘ আজ যদি আমি আপনার মেয়ে হতাম, আপনার গর্ভের সন্তান হইতাম, আর তখন আমার সন্তানহীন ভাগ্য যদি হতো, আমার শ্বশুরালয়ের মানুষজনে আমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত, ঠাট্টা-তামাশা করে অপমান করত তখন তোমার কেমন লাগত মা? আমার ইদানীং খুব জানতে ইচ্ছে হয়। আমাকে বলবে মা? ’ খায়রোন বানু হতবিহ্বল অবস্থায় তাকিয়ে রইল। চোখের কঠিন দৃষ্টি ম্রিয়মান হয়ে এলো। খায়রোন বানু দিশেহারা বোধ করছেন নীরার প্রশ্নের উত্তর দিতে না পেরে। কী উত্তর দেবেন? তিনি জানেন না কী উত্তর দিতে হবে। একমুহূর্তে ডুবে গেলেন গভীর ভাবনার অতলে। আচমকা খায়রোন বানুর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল অজানা আতঙ্কে, ভয়ে। তিনি আর ভাবতে পারছেন না। নীরা খানিক সময় নিয়ে বলল ‚‘ আমি যখন গ্রামের রাস্তা দিয়ে হেঁটে আমার প্রতিষ্ঠানে যেতে থাকি, পাড়ার মানুষে আদরে কাছে ডেকে যত্ন করে কষ্ট দেয়, সহানুভূতি দেখানোর নাম করে তাচ্ছিল্যের সুর টেনে বাজা মেয়ে বলে গালি দেয়। মা ও মা মা আমি কী দোষ করেছি মা? আল্লাই আমার কপালে সন্তান দেন নাই, পেটে সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা দেননি, তিনি চাননি বলেই আজ আমি নিঃসন্তান, আমার গর্ভ নাই। ও মা মা গো এতে আমার কী অপরাধ? সবাই আমাকে কেন অপরাধী চোখে দেখে, আমাকে কেন দোষারোপ করে? ’ খায়রোন বানু কোনো কথা বললেন না। নীরার দু'চোখের কোল বেয়ে নীরবে গড়িয়ে যাচ্ছে ফোটা ফোটা একজীবনের সকল কষ্ট, যন্ত্রণা, অপ্রকাশ্য বেদনার অশ্রু। নীরা কাঁদছে। নৈঃশব্দ্যের ক্রন্দন। খায়রোন বানুর নিজেকে আজ বড্ড অসহায় লাগছে, কেমনটা একটা ঘৃণা হচ্ছে ভাবতেই এই সহজ বিষয়টা বুঝতে এতটা বছর লাগল। খায়রোন বানুর গলা বুজে এসেছে, তিনি কথা বলতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন কণ্ঠস্বর অভিমান করে মুখ ফিরেয়ে নিয়েছে আজ নির্দোষ মেয়েটার উপর এমন অবিচার করার দায়ে। খায়রোন বানুর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে টুপ করে ঝরে পড়ল নীরার ললাটের বাঁ দিকের কার্নিশে। নীরা আচমকা উঠে বসল। হতভম্ব চোখে মেলে তাকিয়ে আছে জীবনের বেলা ডুবে যাওয়া এক অসহায় মায়ের দিকে। উপলব্ধি বড্ড নিষ্ঠুর, যখন তখন যে কাউকে পাকড়াও করে যত্ন করে কাঁদায়। নীরা বিচলিত হয়ে খায়রোন বানুর চোখ মুছে দিতে দিতে বলল ‚‘ মা আমি জানি আপনার মনের কষ্টটা, আমি বুঝি আপনার ছেলের কষ্টটা। আমি অনুভব করি। আমি অসহায়, আমার সেই ক্ষমতা নেই। এই পৃথিবীর বুকে আমার মতো অগণিত নারী আছে। তাদেরও সংসার আছে, তাদের কোনো সন্তান নেই। তবুও তারা বেঁচে আছে, সুখে আছে, একটা অপূর্ণতা হয়ত আছে তবুও তো আনন্দের জীবনটা পার করে দিচ্ছে। আমরাও এভাবে জীবনটা পার করে দিতে পারব মা। ’ খায়রোন বানুর মন সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই মুহুর্তে কথা বলা যাবে না। খায়রোন বানু হাত বাড়িয়ে নীরাকে জড়িয়ে নিল শীর্ণকায় বুকের ভেতর । নীরার তখন মনে হচ্ছিল, অদ্ভুত কিন্তু জনম জনম ধরে চেনা এক সুতীব্র সুঘ্রাণে তার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। এই ঘ্রাণ তার মায়ের। যে মাকে সে হারিয়েছে বয়ঃসন্ধিকালে। এই তো মা। মা গো মা..! 


 অনুতপ্ত ~ হৃদয় খান


মায়েদের আত্ম ত্যাগ সম্পর্কে পড়তে ভিজিট করুন এই লিংকে ↓↓

Mothers Sacrifice

1 Comments

Post a Comment

Previous Post Next Post