আদরপিসি - অরবিন্দ সরকার

সবুজ দিগন্তের মাঝে ছোট্ট একটি গ্রাম। গ্রামের নাম নন্দীগ্রাম। লোকমুখে নান্দগ্যা!

এই নান্দগ্যার সেনবাড়ীর মেয়ে আদর।আদর যত্নে ঘসে মেজে নামটি হলো আদুরী। অল্প বয়সেই মা বাবাকে খেয়ে দুই দাদার ঘাড়ে পিঠে বড়ো। সামান্য জমিজমা , ছোট্ট দুভাইএর দুখানা ছাদযুক্ত চালাঘর। ওপরে মুক্তজানালা ,সেখানের কাঠপাল্লা বা আচ্ছাদন নেই। ছাদেই খাবার খেয়ে, অবশিষ্ট ফেলা ও প্রস্রাবের ব্যবস্থা।নীচে দাদা থাকে, ওপর ঘরে আদর পিসি। উদোম জানালায় বাতাসে চুল শুকানো ,চুল আঁচড়ানো ও আয়না সহযোগে আলতা পরা ,সব একঘরেই।

আদর পিসির এক সখী ছিলো তার নাম ভাগ্যবতী। নামের সঙ্গে মিল নেই কারন বারো বছর বয়সেই বিধবা । তাই তার নিত্যসঙ্গী আদুরী ।সে তার বরের কথা বলে আদরকে ।আদর শুধু মাথা নড়িয়ে শুনছি জানান দেয়। অবিবাহিতা আদরের বয়স এখন কুড়ি । দুজনেই সমসাময়িক। একদিন বিয়ের জন্য সুদূর বিহারের এক যুবক এলো প্রস্তাব নিয়ে। দাদারা হাতে চাঁদ পেল। ওকে বিদায় করলে বোঝা নামবে। কেউ কারো ভাষা বোঝে না ‌। পার করার তাগিদে সেই রাত্রেই বামুন ডেকে বিয়ে হলো । গ্রামের কয়েকজন  উলুধ্বনি ও মন্ত্রপাঠ বিয়ের সাক্ষী রইলো!


ছদেই বাসর ঘর। বিদ্যুতের ব্যবস্থা  নেই। ঘরের দরজাও নেই তাই কাপড় টাঙানো হয়েছে। ভাগ্যবতী জানালার নীচে মশার কামড়ে জোনাকির আলোয় চুপটি করে দাঁড়িয়ে ওদের কথোপকথন শোনার অপেক্ষায় রয়েছে ‌। জামাই বাবাজির নাম সৎপাল কোঠারিয়া। দুজনেই কাপড়ের দরজা ভেদ করে বিছানায় বসলো । অন্ধকার ঘরে বাইরের আবছা চাঁদের আলো প্রবেশ করেছে। জোনাকিরা আলোমাখা গায়ে ছোটাছুটি করছে। এমন সময় আদরকে সোহাগের অছিলায় সতপাল বললো তুমকো বহুত প্যার করতা হ্যায়। তুমহারি নাম বহুত সুরত হ্যায়‌। তুম্ মেরা আঁখো কা তারা হ্যায়। এবার আদর বললো হায় হায় করছো কেনো। আমাকে কি পছন্দ হয়নি। আবার সতপাল বললো তুম্ মেরা জান হ্যায়,তুম্ মেরে চন্দা হ্যায়‌। এবার আদর বললো শুধু হায় হায় করে রাতটা যাবে ? কি যে আছে কপালে? 

এবার সতপাল বুকে টেনে নিয়ে সোহাগ করতে লাগলো আর হ্যায় হ্যায় হ্যায় করেই চলেছে।আদর চিৎকার করে বলে উঠলো আজ যা করার করো হায়। নাহলে এখান থেকে চলো হায়?

নীচ থেকে ভাগ্যবতী ছুটে একদম দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো। সতপাল বললো কৌন হ্যায় ‌। ভাগ্যবতী বললো আমি হ্যায় ভাগ্যবতী। ও ভগ্ বতী আইয়ে আইয়ে এধার । এ কুছ্ নেহি সমঝতা হ্যায়। তখন ঘরে প্রবেশ করে আদুরীকে বললো তুই হিন্দি জানিস না হ্যায়? বল ওকে তুমার কে কে আছে হ্যায়? ওখানে কি কি করতে হবে হ্যায়। তুমি খুব ভালো হ্যায় । এতো সহজ । কথা বলতে শিখলি না ? এই বলে ভাগ্যবতী ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। আবার শুরু হলো সতপালের হ্যায় হ্যায়। এবার আদুরী শুরু করলো -- যা করার করো হ্যায়? সারারাত চলে গেলো হ্যায়? ভালোবাসা বুঝো না হ্যায়? কথার মাথা খেয়েছো হ্যায়?

এবার সতপাল চুপ করে গেলো । আদরকে সোহাগে সোহাগে ভরিয়ে তুললো। যে ভালবাসা পাইনি কোনদিন বাড়িতে কারো কাছে , বাবা মা তো চলেই গেছে? দাদাদেরও চোখের বিষ! ছলছল চোখে আদর সতপালকে জড়িয়ে ধরলো । সতপাল চোখের জল মুছিয়ে আরো কাছে টেনে নিলো ! বাসরের পরিপূর্ণতা বিরাজ করলো !

সকালে ওদের বিদায় যাত্রা ‌‌। যাবার সময় কারো চোখে জল নেই ‌। ভাগ্যবতী বলেই চলে আদুরী কাঁদ কেনিটে , কাঁদ কেনিটে ? আদুরীর কান্না আসে না। এখান থেকে চলে গেলেই বাঁচে! তার সতপালের পলকের হাতছানি মধুর মনে হয়েছে। বারম্বার বলাতে আদুরী বললো ---- উহু হু হু হু হু দাদা যেও।

Post a Comment

Previous Post Next Post