“ভাগ তাসনীম ভাগ, আজ তোকে পারতেই হবে।
নিজের নয়তো নিজের সম্মানের জন্য হলেও।”
দৌড়াতে দৌড়াতে হিল জোড়া ভাঙতে চাইছে তাও মেয়েটি দৌড়ে যাচ্ছে।
পেছনে গাড়ির হর্নে আরো দ্রুত পা চালাতে হচ্ছে তাকে। দিন দুনিয়া কতটা বাজে সেটা আজ বুঝলো তাসনীম।
তাসনীমের দৌড়ানো দেখে দুয়েক মানুষও তার দিকে হা হয়ে তাকিয়ে আছে।
লাল পাড়ের ভারী লেহেঙ্গা টেনে হিল পড়া জুতায় এত দ্রুত কেউ দৌড়াতে পারে নাকি জানা নেই তাদের। কিন্তু, তারাও কিছু করতে পারছে না লোভাতুর দৃষ্টির সাথে নিজেদেরও সংযত রাখতে হচ্ছে কারণ পেছনে কয়েকটা গাড়ির হর্ণ শোনা যাচ্ছে ও একটা লোক গলা ফাটিয়ে ডাকছে।
তাসনীম হাপাতে হাপাতে পায়ে ফোস্কা পড়ার ব্যথা নিয়ে এক গলিতে গিয়ে একটি বিল্ডিং এর ভেতরে গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে বড় বড় নিশ্বাস নেয়।
পা একটু নড়ালেই ব্যথা আরো তীব্র ভাবে শুরু হয়। তাও গ্রিল ধরে আস্তে আস্তে সিড়ি অবধি যায়। রাত তখন সাড়ে দশটারও বেশি।
লাল পাড়ের লেহেঙ্গা, ভারী সাজ এবং গহনাতে সাজানো মেয়েটিকে এভাবে এরকম পরিস্থিতিতে দেখলে কী ভাব্বে সেটা ভেবেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে মেয়েটির।
মুখে আল্লাহ ও সুরা পড়াতে লেগেই আছে। সিড়িতে বসতেই চোখ থেকে এক বর্ষা পানি পড়তে আরম্ভ হয়। বুক দুরুদুরু কাঁপছে সেই সাথে পায়ের প্রতিটা আঙুল ফুলে লাল হয়ে আছে।
হিলজোড়াকে খুলতে নিতেই চাঁপা আর্তনাদ বেরিয়ে আসে মেয়েটির মুখ থেকে। ফোস্কা পড়া জায়গায় চাপ লাগায় সেখান থেকে রক্ত বেরিয়ে আসে৷ এবার লাগছে মেয়েটির জীবন বেরিয়ে যাবে৷ কোনো মতে সহ্য করছে ব্যথাটা।
আশে পাশে ভালো ভাবে তাকায়, কারো সাড়াশব্দ নেই। তাই একটু নিশ্চিত হলো তাসনীম।
ভাবতে লাগলো কিছু ঘন্টা আগের কথা।
.
.
.
হাফিজ বংশের সবচেয়ে বয়স্ক সদস্য হলেন তাহমিনা হাফিজ! তাসনীমের দিদা। সব কিছু তিনিই সামলান, আবার তিনিই ভাঙেন। বলতে গেলে পুরো বংশের সেই একজন যেকিনা নিজের দক্ষতা, পরিশ্রম দিয়ে সব সামলে নিয়েছেন ও গড়েছেন। হাফিজ বংশের এমন কোনো মেয়ে নেই, যে কিনা স্বামীর মৃত্যুর পর নিজে স্বামীর কোম্পানি আবারও দাড় করিয়ে, হাজারো সমস্যার সম্মুখীন হয়েও নিজের সন্তানদের লালন পালন করেছেন। ঢাকার টপ বিজনেস কোম্পানির মধ্যে তৃতীয়তে অবস্থান করছেন সাহেলউদ্দিন হাফিজ কোম্পানি যার মালিক তাহমিনা হাফিজ ও তার ছেলে ইমান হাফিজ।
পুরো ভবন গিজগিজ করছে মেহমানে। কোন কোনায় নেই মেহমান সেটা না দেখলে বোঝাই যাবে না। হৈ হুল্লোড়ে ভরপুর হয়ে আছে। আর সেইসাথে পার্লারের মেয়েরা সাজিয়ে দিচ্ছে তাসনীমকে বিয়ের সাজে।
একটু পর পর তাসনীমকে দেখতে আসছে মেহমানরা, আর আগেই টাকা গুঁজে দিচ্ছেন। যেন পরে আর দেওয়া না লাগে এই ভেবে। মেহমানরা কত কিপ্টা হয়, আজ বুঝলো তাসনীম।
ভয়ের সাথে টেনশনও হচ্ছে প্রচুর। বড় বড় নখ গুলো কামড়াচ্ছে ও খুঁটছে নিজের মত করে। মুখের সাজ শেষ হয়ে যখন তারা চুলের উপর হাত লাগালো, তাসনীম কেঁদে ফেলার মত অবস্থায় বলে ওঠে,
“একদম পেত্নি বানাবে না, আমার কত সুন্দর চুল। জীবনেও কখনো পার্লারে গিয়ে একটুও কিছু করিনি পঁচিশটা বছর। আজ যদি আমার চুলকে পাহাড় বানাও কেউ, আমি তোমাদের চুল কেটে ফেলবো।”
তাসনীমের এই কথাটা শুনে তাহমিনা হাফিজ দরকায় দাঁড়ানো অবস্থায় হেসে ফেলেন। তাহমিনার বয়স এখন উনসত্তর। কিন্তু, তাকে দেখলে যেই কেউ বলবে পঞ্চাশেও তিনি জাননি। অথচ তার তিনটা ছেলের বয়স এখন পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গেছে।
তাহমিনাকে দেখতে পেয়ে তাসনীম দুই হাত বাড়িয়ে দেয় তার জন্য। তাহমিনা বেগম কাছে এসে নাতনীকে জড়িয়ে ধরে দু'টো চুমু খান কপালে।
তারপর আদেশ দেন পার্লারের মেয়েদের যেন হালকা ভাবে বাঁধে চুলগুলো৷ তারাও করতে আরম্ভ করে।
তাহমিনা বেগম নিজের সাথে আনা সার্ভেন্টকে ইশারা করলে, সেই সার্ভেন্ট হাত বাড়িয়ে গহনার সেট দেন।
তখনো গহনা পড়ানো হয়নি তাসনীমকে।
তাসনীম সেই পুরাতন, বংশনীয় গহনা দেখে চমকে যান। তাসনীম কিছু জিজ্ঞেস করতে নিলেই,
তাহমিনা বেগম আগে বলে ওঠেন,
“ভেবেছিস কখনো এই গহনা তোর ভাগ্যে আসবে?”
তাসনীম অবাক হয়ে জবাব দেয়,
“একদমই না!”
তাহমিনা বেগম হেসে বলেন,
“এই গহনাটা দেড়শো বছর পুরোনো। আমার শাশুড়ী দিয়েছিল আমাকে৷ এরপর তোর মাকে দিয়েছিলাম, কিন্তু তোর মা তো আগেই চলে গেলো আমাদের ছেড়ে। তাই ভেবেছিলাম তোর ভাইয়ের বউকে দিবো। কিন্তু, তোর তো কোনো ভাই নেই। আর আমার বড় ছেলের ছোট মেয়ে তুই। অন্য ছেলেগুলোর ছেলে অনেক। তাই ভাবলাম এবার তোকেই দিবো।”
তাসনীম এবার বলে,
“কিন্তু, এই গহনা তো বংশের মেয়েদের দেওয়ার নিয়ম নেই দিদা।”
“নেই জানা আছে। তবে তোর দুই বড় বোন তো পালিয়ে বিয়ে করেছিলো। তাই আমি অনেকদিন ভেবে দেখলাম, এবার নিয়ম বদলানো যাবে। যুগের সাথে সংস্কৃতি বদলে যায়। ঠিক তেমনি, এবার তোকে দিচ্ছি কারণ তুই আমার পছন্দের ছেলের সাথে বিয়ে করছিস এবং পুরো বংশের মান রাখছিস। যা আমার পরের ছেলেদের মেয়েরাও রাখছে না ও ছেলেরাও না।”
তাসনীম দিদার হাত নিজের ঠোঁটের কাছে নিয়ে এসে চুমু খেয়ে বলে,
“তোমার খুব ইচ্ছে ছিলো তাইনা সব নাতি নাতনী ঠিক তোমার মত সাহসী ও কঠোর পরিশ্রমী হবে?”
তাহমিনা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ডিভানে বসতে বসতে বলেন,
“বুড়োদের অনেক ইচ্ছায় থাকে বাচ্চা। কিন্তু সব কী পূরণ হওয়ার মত?”
তাসনীম সাথে সাথে বলে,
“যদি এই বিয়ে হওয়ার পর আমি একদম বদলে যাই?অথবা যেই সম্মান তুমি আমার দ্বারা পেয়েছ আর না পাও তখন?”
“শুধু ভেবে নিবো আমার ভাগ্যে আমার নাতী নাতনীদের ভালো কাজ দেখাই ছিলো না।”
তাসনীম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
পার্লারের মেয়েরা তাসনীমের চুলে সীতি কেটে একটা সুন্দর খোপা বানিয়ে সেখানে শতশত ফুল লাগিয়ে দেয়। আর এবার, গহনা পড়ানো শুরু করে। গহনা শেষে যখন মেকাপটাকে শেষ ফিনিশিং দিবে তখন বাহিরের থেকে আওয়াজ আসা শুরু করে। তাহমিনা এতক্ষণ নিজের নাতনীকে খুব গভীর ভাবে দেখছিলেন। চোখে তার অনেক পানি।
দরজা খুলতেই তাসনীমের নামে হাজারো কথা শোনা যায়। তাসনীম চোখ বন্ধ করে ফেলে। আর ফিসফিস করে বলে,
“এসেছে হনুমানের দল!”
“তাসনীম মুর্দাবাদ, তাসনীম বিয়ে পাগল, তাসনীম পেত্নি, তাসনীম অসহ্যকর, তাসনীম এবার গেলো, তাসনীম এবার বিয়ের পীড়িতে বসলো, তাসনীম এবার থেকে কাজের বুয়া, তাসনীম এবার থেকে অন্যের ঘাড়ে ঝোলা।”
এসব বলতে বলতে পরশ, সীমান্ত, তনয়া, আশা এবং সৌরভ বলতে বলতে ভেতরে ঢুকলো। সবাই হাসছে যারা বাহিরে দাঁড়ানো মেহমান।
আরো অনেকেই এসেছে তাদের সাথে। কিন্তু, পরশ, সীমান্ত, তনয়া, আশা ও সৌরভ হলো তাসনীমের গ্যাং! ভার্সিটির পপুলার গ্যাং। যেখানে তাসনীম লিডার হলেও, সৌরভ আর আশার জন্য তাসনীমের কোনো কথাই গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
কিন্তু তাসনীমের জীবন এরা, আর তাদেরও জীবন তাসনীম।
তনয়া গিয়ে চুপটি করে তাসনীমকে জড়িয়ে ধরে। আর তাসনীমও জড়িয়ে ধরে। পরশ গিয়ে তাসনীমের খোপা থেকে একটা ফুল নিয়ে তাসনীমের কানে ঢুকিয়ে দিতে নিলে সীমান্ত গিয়ে চাপড় মারে পরশের পিঠে খুব জোরেসোরে!
তাসনীম আরেকটা মারে পরশের মাথায়। সবাই হাসছে সমান তালে, আর কথা বার্তাও চলছে।
পার্লারের মেয়েরা তাসনীমকে হিল পড়াবে বলে নিচে বসলেই আশা গিয়ে তাসনীমকে বসিয়ে দেয়। তাসনীম বসলেই তনয়া বলে,
“তো ম্যাডাম, আপনি না বলতেন আপনার আমাদের পরে সবশেষে বিয়ে হবে। এবার আমরাই করলাম না কিন্তু আপনিই প্রথমে?”
তাহমিনা বেগন গিয়ে তনয়ার কান টেনে বলে,
“জন্ম, বিয়ে ও মৃত্যু সবই আল্লাহর হাতে। তাই এসবে ইয়ার্কি চলবে না। আমি যাচ্ছি, তোরা নিজেরাই ওর কান শেষ কর।”
পরশ বলে,
“ওকে বেইব ডোন্ট ওয়ারি সব সামলে নিবো।”
তাহমিনা হাত দিয়ে মাইর দেখিয়ে চলে যায়।”
তাসনীম এবার বলে,
“তোর দিদাকে দিদা বলা যায় না? বেইব বেইব কী?”
“আরে সবার থেকে হট তিনিই, আর দেখ বয়স যতউ হোক তার থেকে বিশ বছর ছোট লাগেন। তাহলে কেন দিদা বলে তাকে গুরুজন বানাবো? আরে চিল সে বেইব বলার মতই মেয়ে।”
সীমান্ত আবার মারতে নিবে, পরশ কানে ধরে।
আশা এবার বলে,
“কেমন লাগছে নিজেকে এরকম লুকে?”
তাসনীম খান্দানী সেই গহনাটার উপর হাত বুলিয়ে বুলিয়ে বলে,
“কেমন আর লাগবে বল। নিজেকে খুব অপরিচিতা লাগছে এই আরকি!”
পরশ ওঠে তাসনীমের কাছে গিয়ে হাটু গেড়ে বসে বলে,
“শায়খকে ভালো লাগে তোর?”
তাসনীম তাকায় পরশের দিক। এক হাতে পরশের মুখে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
“তিনমাসেও তাকে ঠিক তেমনি অপরিচিত লাগে যেমন আজ আমাকে অপরিচিতা লাগছে নিজেকে।”
পরশ তাসনীমের হাত ধরে বলে,
“তাহলে মানা করিসনি কেন?”
তাসনীম তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে,
“এই বাড়িতে সবাই নিজের মন মত করে বড় হয়েছে। এমনকি আমার ছোট চাচার সৎ ছেলে মেয়েরাও। আমার বড় বোন দু'টো বাচ্চা নিয়ে তারপর বিদেশ থেকে এসে বলে, পড়তে তো গিয়েছিলাম সেইসাথে বিয়েও করে নিয়েছি। কত কী ঘটলো এরপর। ছোট বোন বড় বোনের দেখাদেখি হোস্টেলে পড়তে যাওয়ার বাহানায় নিজের প্রেমিককে বিয়ে করে প্রেগন্যান্ট অবস্থায় এসে জানায়। আর তারপর যদি আমি কিছু করতে যাই, অথবা মন মতো করার চেষ্টা করি সেদিন হবে আমার দিদার জন্য শেষ দিন। আর তোরাই জানোস দিদা আমার জন্য কতটা ইম্পর্ট্যান্ট! মায়ের যাওয়ার পর দিদাই আমার দ্বিতীয় ও শেষ মা। কখনোই দিদার মত নয় মায়ের মত সব করেছে।
আর এটা বিজনেস রিলেটেড বিয়ে হলেও আমার দিদার জন্য অনেক বড় খুশি হবে তাই আমি কখনোই মানা করতে পারবো না।”
সৌরভ টিস্যু পাস করলেই, তাসনীম হেসে কান্নাটুকু মুছে। পার্লারের মেয়েরা সব ঠিক করে দিয়ে বেরিয়ে পড়ে। তাসনীম পুরো রুমে তাকায় কিন্তু একজনকে না পেয়ে বলে ওঠে,
“ইরশাদ কই?”
আশা বলে,
“বলিস না, এমনিতেও ছেলেটা তোর বিয়ের কথা বললেই পালায়, আর তোর বিয়েতে আসবে ইম্পসিবল!”
তাসনীম অবাক হয়। সৌরভ ইয়ার্কি হিসেবে বলে,
“এমন ছেলে কমই দেখেছি, ছেলেটা এত কম কথা বলে, আর আমাদের মাঝে এত কম থাকে যে লাগেই না সে আমাদের গ্যাং এর। ছেলেটা এক নাম্বারের বলদ!”
তাসনীম রেগে বলে,
“সৌরভ মাইন্ড ইউর ল্যাঙ্গুয়েজ!”
পরশ তাসনীমকে ঠান্ডা করে। তাসনীম কল দিলে, এক কলেই তোলে ফোনটা।
তাসনীম বলে,
“হেই লুজার কই তুই, আজ তোর বেস্টফ্রেন্ডের বিদায় আর তুই আসিসনি কেন? জানিস সবাই এসে আমাকে কাঁদিয়ে দিলো, আর এই সৌরভ তোকে বলদ বলে কখন আসবি তুই? শোন মনে রাখিস এবার যদি তুই আমার শেষ বিদায়ে আমি তোকে না দেখি, আল্লাহর কসম, তোর মাথার কসম আমি তোর সামনে জীবনেও আসবো না।”
বেশকিছুক্ষণ এভাবেই চুপ থাকলো তাসনীম, তার গরম নিশ্বাস গুলো অপরপ্রান্তে থাকা ইরশাদ ঠিকই শুনলো। জানা নেই তাসনীমের কী অবস্থায় আছে ছেলেটা, জানা নেই তার কী করছে ছেলেটা। কিন্তু তাসনীমের সেন্স বলছে ছেলেটা ঠিক নেই, একদমই ঠিক নেই।
আর একমিনিট পর ইরশাদ বলে,
“আসছি আমি বরযাত্রা আসলেই আমিও ঢুকবো।”
এই বলে কেটে দেয় ফোনটা।
আশা পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে তাসনীমকে। পুরো ঘর নিরবতায় আচ্ছন্ন। এত সুন্দর পরিবেশেও এই গ্যাং এর মনে একটুও শান্তি নেই। একজন সারাজীবনের জন্য চলে যাবে আর থাকবে না হয়তো এমন কেউ যার কথাগুলো কেউ গুরুত্ব দিবে না, একটুতেই কাঁদিয়ে দিবে না অথচ সে থাকবে সবার একমাত্র জীবন। যাকে ছাড়া পুরো গ্যাং অচল। হবে ফোনে আলাপ, কিন্তু একটু পর শাশুড়ীর ডাকে, স্বামীর ডাকে ব্যস্ত হয়ে কল কেটে দিবে। আর হবে না ঘন্টার পর ঘন্টা আলাপ ও মজা। কতটা বেরঙিন হয়ে যাবে আজকের পর থেকে। সেটা ভেবেই কান্না আসছে সবার। কেন হয় এমন? সংসারের ভাড়ে প্রতিটা ছেলে মেয়ের জীবনে সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলো শুধুই কেন স্মরণীয় হয়ে থাকে? কেন আবারও দেখা যায় সেসব দিনগুলো। মানুষ গুলো একটা অনুষ্ঠানের পর এতটা অচেনা হয়ে যায় কেন? তাহলে এটাকেই সমাজের নীতি বলে?
তাসনীমের চোখের পানিগুলো পড়তে নিবে তখনি আশা বলে,
“জানিস, আমাকে আমার বস প্রপোজ করেছে আর বলেছে আমাকে নাকি মডেলিং এর জজ বানাবে। আমি তার টাকলু মাথায় টোকা দিয়ে বলেছি আমাকে যে বিশ্ব ইউনিভার্স বানায় তাহলে আমি রাজী।”
পুরো রুম হাসতে আরম্ভ করে, তাসনীমের চোখ থেকে পানি পড়লেও সাথে সাথে টিস্যু দিয়ে মুছে ফেলে।
আশা চুমু খায় তাসনীমের গালে।
তাসনীম ও তার বন্ধু বান্ধবরা এক গাড়িতে হলে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। তাই সবাই গাড়িতে ওঠে। গাড়িতে ওঠেই নিজের বন্ধুদের দিক তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে সেই পাঁচটি বছর আগের কথা ভাবতে থাকে।
.
.
.
.
পরশ, সীমান্ত, আশা, তনয়া, সৌরভ, ইরশাদ ও তাসনীম এই সাতজনের গ্যাং ভার্সিটির ফার্স্ট সেমিস্টার থেকে। তাসনীম অনেক বড় বংশের ও বড়লোক হলেও সে কখনোই তার লেভেলের কারো সাথে বন্ধুত্ব করেনি। এত বড়লোকের ছেলে থাকতেও, পরশের সাথে বন্ধুত্ব করেছে কারণ সে অন্যদের তুলনায় খুবই ভদ্র ও পরিশ্রমী। ফ্যামিলির দেওয়া টাকায় চলে না, নিজে টিউশনি পড়িয়ে যেই বেতন পায় সেটাতে সব করে। হোস্টেলে থেকে বড় হওয়া ছেলেটার স্বভাব সব কিছুতে তাসনীম বন্ধুত্বের আলাদা শেকড় খুঁজে পায়।
আশা সে তো সেই ছোট বেলা থেকে নিজেকে সুপারস্টার বানাতে চেয়েছে। মধ্যবিত্ত থেকে আসা এই মেয়েটি পড়ালেখার পাশাপাশি মডেলিং করে ও সেটা থেকেই উপার্জন করা টাকা ট্রিট হিসেবে বন্ধুদের দেয় ও নিজের পড়াশোনা চালায়। মেয়েটা বুঝে কষ্ট কাকে বলে, মধ্যবিত্ত ফ্যামিলি থেকে বিলং করার চাপা কষ্টগুলো। তাই তাসনীম যখন হাত বাড়িয়ে দেয় বন্ধুত্বের সে কোনো কথা ছাড়াই হাতটা নিজ থেকে বাড়িয়ে দেয়। এরপর থেকে তাদের বন্ধুত্বে কখনোই ভাঙন সৃষ্টি হয়নি।
তনয়া হলো চুপচাপ ও পড়ালেখা করার মত মেয়ে। পারিবারিক ঝামেলা নিতে না পেরে চলে আসে বাসা থেকে। সে বড়লোকের ঘরের, কিন্তু দেখায় একদম মধ্যবিত্ত! যেন একটু শান্তিতে থাকতে পারে ভার্সিটিতে। বড়লোক দেখালে কত যে অশান্তি হয় সেটা তার জানা আছে।
কিন্তু তাসনীমকে দেখার পর মিথ্যা বলতে পারেনি। সবাই জানেই তাসনীম কার মেয়ে, কার নাতনী। কিন্তু, ভাবতে পারেনি এত বড়লোকের ছেলে মেয়েরা থাকতে কেন তাদের কাছে আসলো।
তাসনীমের এই গুণ দেখেই সবাই তাকিয়ে থাকতো ও সুনাম করতো।
সীমান্ত ও পরশ দুজনেই হিন্দু, কিন্তু তারা সবাইকে সম্মান করতো, কেউ যদি তাদের ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে তারা দু'জনই সামলিয়ে নেয় এবং চলে আসে সেখান থেকে। ধর্মের স্লোগানে একটা অনুষ্ঠান হলে, সবাই একটা সময় হিন্দু মুসলিমে ভেদাভেদ নিয়ে প্রশ্ন করা শুরু করলে সেদিন তাসনীম ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করে আর সবার ধর্মকে কীভাবে সম্মান করা যায় সেসব ব্যাপারে বুঝিয়েছিল। সীমান্ত সেদিন থেকে তাসনীমকে ভালো লাগতে শুরু করে। ভালো লাগা একটা সময় ভালোবাসায় পরিণত হয়, কিন্তু তাসনীমের বিয়ে ঠিক হলে সে মুভ অন করে। চারটা বছরের জমানো ভালোবাসা এখনো ভুলেনি সে।
সৌরভ সে তো ফাঁকিবাজদের মধ্যে অন্যতম ভার্সিটির। কপি করা ছাড়া পরীক্ষাতে পাশ করতে পারে না, আর সেইসাথে ঘুমানো ছাড়া তার কাজ বলতেই নেই।
ভাগ্যিস সে একদিন তাসনীমের পাশে বসেছিল, তাসনীমের পুরো খাতা কপি পেস্ট করে দেয় তাসনীমের বোঝার আগেই। আর দ্রুত খাতা জমা দিয়ে চলে আসে। এভাবে টানা কয়েকদিন যাওয়ার পর তাসনীম যখন বুঝলো সেদিন কী না ঘটলো, ভাবলেই সৌরভ শিহরিত হয়। এরপর থেকে হাজারও সরির পর যখন তাসনীম মানলো তখন তাদের গ্যাং এ সামিল হয়ে যায়।
শেষ রইলো ইরশাদ। আজ অবধি ইরশাদকে বুঝলো না তাসনীম। একটা দোকানদার যখন গরীব ছেলেকে মারছিলো তখন ইরশাদ বাঁচায় ছেলেটাকে। তাসনীম সেই পথেই যাচ্ছিলো, যেহেতু আইডি কার্ড ছিলো তার কাছে তাই বুঝেছিলো তাসনীম তারই ভার্সিটির। সেদিন খুব মায়া হয় ইরশাদের প্রতি। গাড়ি থামিয়ে যখন ওর কাছে আসে তখন ইরশাদ চলে যাচ্ছিলো। থামিয়ে দিলেও বেশি একটা কথা বলে না সে।
পরেরদিন খুব খোঁজে তাসনীম ইরশাদকে। পায় না কোথাও। তার পরের দিনও খোঁজে। আরো চার পাঁচইদন পর যখন ইরশাদ নিজে তাসনীমের কাছে আসে, তখন তাসনীম লজ্জায় কিছু বলতেও পারছিল না।
ইরশাদের প্রথম কথা ছিলো,
“এক অচেনা ছেলেকে এভাবে খুঁজতে হয় না প্রথম দেখাতেই। ছেলেটা খারাপ কী না, ভালো কী না, তার ব্যাপারে আদৌ কিছু জানেন কী না, সবই ম্যাটার করে। এটাতে আপনারও সেফটি জড়িত। ভার্সিটিতে পড়েন আপনি এতটুকু ম্যাচুরিটি এসেছে আপনার মধ্যে। পরবর্তীতে এমন বোকামি যেন না দেখি!”
এই বলে চলে যায়, তাসনীম কিছু বলতেও পারে না৷ কেমন যেন বেকুব হয়ে যায় তার কথাতে। ছেলেটার কণ্ঠে একটা নেশা আছে আলাদা রকমের। তার পোশাক আশাক সবই নরমাল, তার গেট আপও। ভেবে পাচ্ছিলো না কীভাবে কী করবে সে।
আস্তে আস্তে আবারও সেইম বোকামি করতে করতে হঠাৎ আবারও সামনে আসে ইরশাদ। ততক্ষণে অনেক সাহস সঞ্চয় করে নিয়েছিলো মনে মনে তাসনীম।
তাসনীম এক নিশ্বাসে বলে,
“এবার আমি বলব আপনি না। আমার নাম তাসনীম হাফিজ। আমি জানি না তোমার নাম কী, তুমি কী করো না করো, কোথায় থাকো, বায়ো ডাটা কী ইত্যাদি। আমি শুধু জানি বন্ধুত্বে এসব জানা প্রয়োজন হয় না। তুমি শুধু বন্ধুত্বের হাত বাড়াও, আমার গ্যাং এ যোগ দাও, প্রমিজ করছি কখনোই তোমার বায়ো ডাটা ইত্যাদির কথা জিজ্ঞেস করবো না।”
ইরশাদ মনে মনে খুব হেসেছিলো, বাহিরে মুচকি হাসিই বজিয়ে রেখেছিলো। মেয়েটা যে খুব বোকা সেটা বুঝতে পারে। হাত বাড়িয়ে দেয় তারপরেই। এরপর হলো, তাসনীমের কথা বার্তা, আর ইরশাদ মনোযোগ দিয়ে শোনা ও ভেতরে কিছু ইন্টারেস্টিং প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া। তাসনীমের এসব ভালো লাগতো। অন্যদের তুলনা ইরশাদকেই বেশি সময় দিতো তাসনীম, কথাও হতো বেশি। কিন্তু, কখনোই জানতে পারেনি ইরশাদ আসলে কে? কোথা থেকে বিলং করে ইত্যাদি। অন্যেরা জিজ্ঞেস করলে বলতো, সে চিটাগং থাকে মধ্যবিত্ত ও এখানে পড়াশোনা করছে। কিন্তু তাসনীমের লাগতো না এসব সত্য। মন বলতো একটা মস্তিষ্ক বলতো আরেকটা।
কিন্তু একটা দিক অনেক ভালো ইরশাদের। পরীক্ষার আগে যদু কেউ বলতো এই সাবজেক্টের এই অধ্যায় বুঝে না। সাথে সাথে ভিডিও কলে নিয়ে গিয়ে পুরো সাবজেক্ট বুঝিয়ে দিতো।
ইরশাদের বয়স কতো? হ্যাঁ বত্রিশ! তাসনীমের থেকে সাত বছরের বড়। ভার্সিটি থেকেই মাস্টার্স কমপ্লিট করেছে। যখন তাদের বন্ধুত্ব হয় তখন শেষ সেমিস্টারে ছিলো ইরশাদ।
.
.
.
তাসনীমের ধ্যান ভাঙে আশার চিল্লিয়ে গলা ফাটানোতে। তাসনীম বলে,
“কী হয়েছে?”
আশা জানালা দিয়ে তাকিয়ে বলে,
“বর যাত্রী এসে পড়েছে!”
তাসনীমের দীর্ঘশ্বাস বের হয়। সেই অনেক আগেই হলে পৌছে গ্রিন রুমে বসে আছে৷ পা কাঁপছে সবই কাঁপা-কাঁপি শুরু। ভালো লাগছেই না কিছু। কেন যেন সবই অন্যরকম লাগছে তার কাছে। ভালো কোনো ফিলিংসই আসছে না, সব জোরপূর্বক মনে হচ্ছে।
দরজা খোলার শব্দে সেদিকে তাকায় সবাই।
তাহমিনা হাফিজ, তার বাবা ইমান হাফিজ ও চাচিরা এসেছে তাসনীমকে নিতে।
তাসমীন ওঠে দাঁড়ায়৷ বাবাকে জড়িয়ে ধরে, ইমান সাহেবও জড়িয়ে ধরেন। চাচিরা পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তাহমিনা হাফিজ চোখ মুছছেন বার বার।
তাসনীমকে নিয়ে আস্তে আস্তে করে নিচে চলে আসেন। তখনও বরযাত্রী ভেতরে প্রবেশ করেনি।
তাসনীমকে বসিয়ে দিলে, এক এক করে আত্মীয়রা দেখে যাচ্ছেন, ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
একটু পর বরযাত্রী ভেতরে প্রবেশ করলে প্রথম দেখা যায় শায়খ চৌধুরীকে। হ্যাঁ একটু পর এই নামেই সবাই তাসনীমকে চিনবে। তারপর থেকে হাফিজ না বিলুপ্ত হয়ে যাবে তার সার নেইম থেকে।
তখন লেখা থাকবে সব জায়গায় তাসনীম শায়খ চৌধুরীকে।
শায়খ চৌধুরীর সাথে চোখাচোখি হলে, শায়খ মুচকি হেসে তাকায় তাসনীমের দিকে। তাসনীম চোখ নামিয়ে নেয়৷ একটু পর তাসনীমের চাচাতো মামাতো বোনেরা টাকা নিতে পারলেই ছেড়ে দিবে ঠিক তখনি লাইট চলে যায়। আর সম্পূর্ণ হল অন্ধকারে ছেড়ে যায়। দুই সেকেন্ডের জন্য একটু নিরব হতেই আবার চিল্লাপাল্লাতে ভরে যায়। সবাই লাইট ফিক্স হবে কখন সেটা জানতে চায়৷ আর বাবারা চাচারা সবাই ম্যানেজারকে খুঁজছে। কিন্তু ততক্ষণে যে ম্যানেজারকে সবাইকে সরিয়ে ফেলা হিয়েছে সেটা তো কেউই জানে না।
লাইট অন হতেই সবার জানে জান ফিরে আসে। শায়খের বাবার মনে আছে সে তার ছেলের হাত ধরে রেখেছিলেন কিন্তু তার বদলে অন্য ছেলের হাত এসে পড়লে চমকে যান তিনি। শায়খ নেই কোথাও। ভাবতেই বুকে চিনচিন ব্যথা অনুভব করেন তিনি।
শায়খকে সবাই খুঁজতে আরম্ভ করলে, যখন দশ মিনিটের বেশি হলেও খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন গার্ড এসে শায়খের বাবার কাছে ও তাসনীমের বাবার কাছে একটা লেটার দিয়ে যান।
তাসনীম সবই লক্ষ্য করে। তাসনীমের বাবা ও শায়খের বাবা একটা রুমের দিক চলে গিয়ে সেটা খুলতেই পড়তে আরম্ভ করেন। দু'টো একটু সেইম হলেও শেষে গিয়ে ভিন্ন।
“প্রিয় শায়খের বাবা,
যদই আপনি আপনার ছেলের মঙ্গল কামনা করে থাকেন তাহলে এই বিয়েতে আপনার ছেলেকে পাবেন না। আর যদি পেতে চান তাহলে মৃত দেহ পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। আমি খুব ঠান্ডা মেজাজে বলছি, তাসনীমকে আমার চাই। তাই কোনো সমস্যা ক্রিয়েট না করে সুন্দর ভাবে আমাকে তাকে দিন হয়ত আপনার ছেলের জানাজা পড়তে তৈরী থাকুন!
ইতি
“আপনার হবু বউয়ের হবু বর!”
শায়খের বাবা শাকিল চৌধুরী এটা পড়ে ভয়ে কাঁপতে থাকেন ও ঘামতে থাকেন। খাটে বসে পড়লেই ইমান সাহেব পড়তে আরম্ভ করেন।
ঠিক অপর চিঠিতে লেখা,
“প্রিয় হবু শশুড়,
আপনার মেয়ের আজই বিয়ে হবে চিন্তা করবেন না। আমি একদমই পর কেউ না। কখনো মনের কথা আপনার মেয়েকে জানানো হয়নি বলেই সে এই বিয়েতে রাজী হয়েছে। জানানো হলে আপনার আগের দুটো মেয়ের মত আপনার বিরুদ্ধে গিয়ে, আমার সাথেই বিয়ে বসতো। তাই মেয়েটাকে আমি একটু আলাদা স্টাইলে বিয়ে করতে চাই। ঠিক নিজের মত করে। কারণ মাফিয়ারা কারো সম্মতিতে অথবা প্রেমের বিয়ে করে না কখনো। হয়ত মেয়েকে উঠিয়ে নিয়ে বিয়ে করে অথবা থ্রেড দিয়ে।
ইতি
“আপনার মেয়ের হবু জানাই!”
তাসনীম ভয়ে কেঁদে দেয় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। কেউ নেই দরজার সামনে শুধু দাঁড়িয়ে আছে তাসনীম, জানতে শুধু আসল কাহিনী কী। এখন বুঝলো যাকে সে নিজের বন্ধু বানাতে চেয়েছিলো, কোনো আইডেন্টিটি ছাড়াই সে কী না একজন মাফিয়া!!!
পুরো চিঠিটা লেখার স্টাইলই ইরশাদের। একদিন সে পড়েছিলো লুকিয়ে লুকিয়ে তারই ব্যাগে। কিন্তু, কোন মেয়ের জন্য লিখেছিলো আজ বুঝলো তাসনীম৷ এত অবুঝ কেন তাসনীম সেটা বুঝলো না। নিজের বিপদ নিজেই ডাকে মেয়েটা। যখন ইরশাদ প্রথম দিনই বলেছিলো কারো সম্পর্কে না জেনে তাকে খুঁজতে নেই সেদিনই কেন ফেরত আসলো না তাসনীম? কেন তার মাথা খারাপ ছিলো? তাসনীম কান্না মুছে, এখন তার মাথায় একটা জিনিসই কাজ করছে আর সেটা হলো, বের হতে হবে, পালিয়ে যেতে হবে। এরপর সব ঠান্ডা হলে আবার ফেরত আসা যাবে।
এই ভেবে সবার আড়ালে যেভাবেই হোক পেছনের গেইট দিয়ে পালায় তাসনীম আশাকে একটা মেসেজ দিয়ে।
"উন্মাদ আমি" গল্পের আরো পর্ব ধারাবাহিক আসবে। তাই মেঘপিওন এর সঙ্গে থাকুন।
~ মেঘপিওন - মননশীল সাহিত্যের দর্পন।

আহ
ReplyDeleteNice story
ReplyDeletePost a Comment